• Home
  • Articles
  • Literature :: Bangla
  • আওয়ামী লীগের ইসলামী রাজনীতি - ৫ই সেপ্টেম্বর ৪২ মুক্তিসন (২০১২ সাল) পর্য্যন্ত

আওয়ামী লীগের ইসলামী রাজনীতি - ৫ই সেপ্টেম্বর ৪২ মুক্তিসন (২০১২ সাল) পর্য্যন্ত

আওয়ামী লীগের ইসলামী রাজনীতি -  হাসান মাহমুদ - ৫ই সেপ্টেম্বর ৪২ মুক্তিসন (২০১২ সাল) পর্য্যন্ত

বাংলাদেশই একমাত্র রাষ্ট্র যেখানে সাংবিধানিকভাবে ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল, মুক্তিযুদ্ধে ধর্মদুর্বৃত্ত ইসলাম-ব্যবসায়ীদের কসাইপনার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার ফলে। সে সংবিধানের সর্বনাশ করেছে স্বৈরশাসকেরা। শেষ ভরসা ছিল ২০০৮ সালে আ-লীগের নির্বাচনী ওয়াদা, ৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাওয়া হবে।  কিন্তু সংসদে সংবিধানও পাশ হয়ে গেল - ধর্মনিরপেক্ষতা থাকল, ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ হলনা এবং ইসলামি শব্দাবলী থেকে গেল। অর্থাৎ ‘‘কিছুটা বাংলাদেশ, একটু ইসলাম-ব্যবসা ও ইকটু পাকিস্তান’’, এই জগাখিচুড়ি হল। 

কারণ ?

কারণ আওয়ামী লীগের জামাত-ভীতি। পঁচাত্তরের পরে ওটা চিরকালই ছিল এবং তার কারণও ছিল।  দশ বছর আগে পর্য্যন্তও জামাতের রাজনৈতিক, আর্থিক, সাংগঠনিক ও সামাজিক শক্তিকে উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল।  সেজন্যই রাজনৈতিক স্বার্থে জামাতের সাথে আ-লীগ জোট করেছিল।  জামাত-বিরোধী অবস্থানে যাবার পর আ-লীগ সুশীল ও সাংস্কৃতিক সমাজের সমর্থন, ইসলাম-ব্যবসায়ী যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি জাতির চরম বিতৃষ্ণা, জাতির প্রবল আধুনিকায়ন, উদীয়মান নারীশক্তি এসব প্রগতিশীল শক্তির ওপরে ওপর আস্থার চেয়ে অন্যান্য মৌলবাদীদেরকে জামাতের বিরুদ্ধে দাঁড় করাবার "কৌশল" নিয়েছিল।  সেই থেকে অন্যান্য মৌলবাদীদেরকে প্রশ্রয় দেয়া আ-লীগের ডিএনএ-তে ঢুকে বসে আছে।  আ-লীগ বোঝেনি যে, মৌলবাদী সব দলেরই উদ্দেশ্য জামাতের উদ্দেশ্য, শারিয়া-ভিত্তিক রাষ্ট্র।   

  • ২০০৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ খেলাফত মজলিসের সাথে "ফতোয়া চুক্তি" স্বাক্ষর করেছিল। অথচ “নারীকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হোক”, এটা তত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ওই খেলাফত মজলিশেরই প্রস্তাব - ১৩ জুলাই ২০০৮।
  • ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৮ সালে ভূমিধ্বস জয়লাভের পরে আ-লীগ সে চুক্তি বাতিল করে ইনকিলাবী দলকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করেছিল তাদের "ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়" স্থাপনের দাবী মেনে নিয়ে (যা সব মৌলবাদী দলেরই দাবী)। তখন ইনকিলাবে প্রবল আওয়ামী-বন্দনা ও জামাত-নিন্দা প্রবাহিত হত।
  • থেমেসিসের ভাস্কর্য্য সরানোর সাফল্যের সাথে সাথে যেভাবে হেফাজত দাবী করেছে দেশের সব ভাস্কর্য্য সরাতে হবে, ঠিক তেমনি "ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়" স্থাপনের দাবী সফল হবার সাথে সাথে ইনকিলাব দল দাবী করেছিল বায়তুল মুকাররমের  খতিবকে প্রধান বিচারপতির মর্যাদা দেয়া হোক- ১৩ জুলাই ২০০৮। এই সেই ইনকিলাব যে কিনা একাত্তরের ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধী "মওলানা" মান্নানের দল, যে কিনা "নামাজ বাধ্যতামূলক" এই আইন না বানালে সামরিক অভ্যুত্থানের উস্কানী দিয়ে রেখেছে - ইনকিলাব ২৩ মে ২০০৭।     
  • সময়ের সাথে সাথে দুধ ও শাঁস মিলে গিয়ে আঁটিটা অর্থাৎ আ-লীগ ছিটকে পড়লে আবার ইনকিলাবে আ-লীগ-নিন্দা শুরু হয়ে যায়। তখন আ-লীগ নুতন মৌলবাদীর সন্ধানে নেমে পেয়েছে হেফাজতকে, একের পর এক তার প্রগতিবিরোধী মৌলবাদী নীতি মেনে নিয়েছে।

কিন্তু আ-লীগ বোঝেনা যতই সে ওদের দাবী মেনে নিক, যতই টুপি-দাঁড়ি-হিজাব পরুক, যতই হজ্জ্ব ওমরাই করুক, যতই তসবি-টেপা ছবি ছাপুক, কখনোই সে ইসলামি হবার প্রতিযোগিতায় মৌলবাদীদের (জামাত, আমীনি, ইনকিলাবী, খেলাফত, ইসলামী ঐক্যজোট, হেফাজত ইত্যাদি) সামনে টিকতে পারবে না। 

আ-লীগের জানা দরকার রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মব্যবসায়ীকে মাথায় তুলে শেষ পর্য্যন্ত কেউ পার পায় নি, জাতির সুশীল-সাংস্কৃতিক সমাজ ও নারীদেরকে তার চরম মূল্য দিতে হয়েছে।   ওদের কৌশল ধুর্ত, দক্ষ এবং রাজনীতি-নিরপেক্ষ।  ক্ষমতায় থাকলে তো ভালই কিন্তু না থাকলেও দেশকে ক্রমশঃ ওরা সফলভাবেই শারিয়া-রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।  তাই অন্যের দ্বারা নিজেদের এজেণ্ডা বাস্তবায়নই ওদের সফল পদ্ধতি। রাজনৈতিক সমর্থনের ঘুষ হিসেবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জিয়াউল হক, জিয়াউর রহমান, এরশাদ ও বি-এন-পি-ওদের উপহার দিয়েছে রাজনৈতিক বৈধতা।  এখন আ-লীগও সেই কাতারে সামিল হল, কাজেই ওদের আর সরাসরি ক্ষমতায় যাবার দরকারই নেই।

অসংখ্য মওলানা-মুফতি-মোল্লা নিয়ে দেশজুড়ে যে অনিয়ন্ত্রিত আলেম-সমাজ গড়ে উঠছে তাঁদের প্রায় সবাই নারী-নীতির বিরোধী। এঁদের যোগ্যতার কোন দৃশ্যমান মাপকাঠি নেই, জাতির বা সরকারের কাছে জবাবদিহিতাও নেই। এঁদের বেশীরভাগই আধুনিক রাষ্ট্রপরিচালনার কিছুই জানেন না কিন্তু অবলীলায় বিশ্বের তাবৎ সমস্যার ইসিলামী সমাধান পেশ করে থাকেন। ক্রমাগত দুর্বল সরকারের সুযোগে তাঁরা ধীরে ধীরে সরকারী নীতির নির্দেশক হয়ে উঠছেন এবং আরও উঠবেন। তাঁদের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ করলে সামাজিক দিক দিয়ে নেমে আসবে ‘‘মুরতাদ’’ ফতোয়ার খড়্গ ও ক্যাডারদের হুমকি-অত্যাচার।  কারো সাধ্য হবেনা তা প্রতিরোধ করার। সরকারে প্রত্যক্ষভাবে না থাকলেও কিংবা আংশিকভাবে থাকলেও তাঁরা এক অদৃশ্য সরকার চালাবার কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। এর মধ্যেই বিভিন্ন ব্যাপারে সরকারী উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বায়তুল মুকাররমে গিয়ে গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা তাঁরা ইমাম-খতিবদের ডেকে সেক্রেটারিয়েটেই নিতে পারতেন। 

আ-লীগের সৈয়দ আশরাফ মিনমিন করে বলেছেন আগামী নির্বাচনে তাঁরা ক্ষমতায় গেলে বাহাত্তরের সংবিধান প্রতিষ্ঠা করবেন - ০৩ জুলাই জনকন্ঠ । এই রাজনীতিকেরা জাতিকে গর্দভ মনে করেন।  ২০০৮ সালে সংসদে ৩৪৫ আসনের ২৯১ আসন পাওয়ার পরেও তাঁরা যা করতে পারেনি তা আর কখনোই পারবেন না। এর মধ্যেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ সুশীল সমাজের প্রবন্ধ উঠছে ‘‘শেখ হাসিনা’র পাকিস্তান যাত্রা’’, ‘‘আধা-পাকিস্তান’’ ইত্যাদি শিরোনামে। তাই রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ হওয়াটাই যথেষ্ট নয়, ধর্মেও রাজনীতির ব্যবহার বন্ধ করা দরকার। মসজিদে ওয়াজ মহফিলে রাজনীতি বন্ধ করা দরকার, এমনকি শিক্ষাঙ্গনেও। মাদ্রাসা, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার    

দড়িকে সাপ মনে করলে ক্ষতি নেই কিন্তু সাপকে দড়ি মনে করলে অসুবিধা আছে। ওদের কৌশল অনেক এবং সেগুলো চোখের সামনেই ঘটছে কিন্তু আ-লীগ তা থেকে কিছুই শিখছে না বা রাজনৈতিক স্বার্থে চোখ বন্ধ করে আছে। কিছু দেখাচ্ছিঃ-


১। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে মওদুদি’র জীবনি ঢুকিয়ে দিয়েছে - সমকাল ২৪ জুন ২০০৮।

২। আটকে পড়া বিহারীদের যারা একাত্তরে নাবালক ছিল কিংবা তার পরে জন্মেছে তাদের বাংলাদেশী নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে বলে ওদের ভোট একলাফে বেড়েছে ৩ লাখ - সংগ্রাম ২৪ মে ১৯৯৮।

৩। ফাজিল-কামিলকে ডিগ্রী ও মাষ্টার্সের সমমান আদায় - নয়া দিগন্ত ২২শে জুলাই ২০০৮।

৪। বাচ্চাদের মধ্যে বিনামূল্যে মওদুদি-বান্না’র বই বিতরণ করে তার ওপরে প্রতিযোগিতা ও পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা।

৫। মন্ত্রী থাকাকালীন ওরা  সরকারে অসংখ্য অনুসারীকে নিয়োগ দিয়েছে - ‘‘সর্বত্র জামাতের কালো থাবা’’ - ভোরের কাগজ ২৯শে ডিসেম্বর ২০০৪। সরকার বদল হলেও এরা সর্বত্র তাঁদের প্রভাব খাটাবে।

৬।  কিছু বিচারপতি, সুশীল ব্যক্তিত্ব ও সরকারী আমলাদের নিমন্ত্রণ করে এনে শারিয়া আইনের সমর্থনে বিশেষজ্ঞ-মার্কা বক্তব্য দেয়ানো যাঁরা শারিয়ায় বিশেষ অজ্ঞ। ২০০৮ ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিকে সেনাপ্রধান মইন আহমেদ বলেন দেশের দক্ষিণ এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে মসজিদ-কেন্দ্রিক বহুতল দালান বানানো হবে এবং সেগুলোর তত্ত্বাবধানে থাকবেন মসজিদের ইমাম ও তাঁর দল। সরকারের দায়িত্ব ও অধিকার ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়ার পরিণাম ভয়াবহ হবেই।

৮। যখন স্বামীরা কাজে থাকেন তখন ওদের নারী-বাহিনী দ্বারে দ্বারে হানা দেয়। স্ত্রীরা তাদের ঘরে বসিয়ে কিঞ্চিৎ আথিতেয়তা করেন। এই সুযোগে তারা ওই স্ত্রীদেরকে ইসলামে ‘‘দীক্ষা’’ দেয়, অবশ্যই সেটা হজরত শাহ জালাল শাহ মখদুমের ইসলাম নয় সেটা মওদুদি-ইসলাম। 

৯। কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা রোজা রেখে হরতালে নামবে- ১০ই জুলাই ইত্তেফাক। এর আগে কোরান হাতে নেমেছিল। অর্থাৎ ওরা নাগরিক অধিকারের সুযোগে ইসলামের বিভিন্ন ‘‘অস্ত্র’’ প্রয়োগ করার কৌশল করছে। এটা বেআইনী নয়। সরকার হার্ড লাইনে গিয়ে ওদের আপাততঃ প্রতিহত করতে পারে কিন্তু উচ্ছেদ করতে পারবে না কারণ ধর্মবিশ্বাসকে পুলিশ লেলিয়ে উপড়ানো যায় না।

নিয়তির কালখেলা - যে জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রথম সংসদের প্রথম বক্তৃতায় সুস্পষ্ট ঘোষণা দিলেন পাকিস্তান হবে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র - যে মৌদুদী খোলাখুলি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিল এবং বলেছিল জিন্নাহ "কাফের-এ আজম" সেই পাকিস্তান আজ মৌদুদীবাদী জামাতি-কব্জায় নিষ্পেষিত।  এতেই প্রমাণ হয় ষড়যন্ত্রময় রাজনৈতিক ঘোলাজলে মাছ তো মাছ, কুমীর পর্য্যন্ত শিকার করতে ওরা কত দক্ষ।  ভেল্কিবাজীর এমন উল্টাপুরাণ ওখানে যদি হতে পারে আমরা এমন কি পালোয়ান যে এখানেও তা হবে না?

মৌলবাদীদের এজেন্ডাই হল স্বদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক উপনিবেশ বানানো। ইনকিলাবের উদ্ধৃতি দিচ্ছি, ইতিহাসবিদেরা ভির্মি খাবেনঃ-

(১) ‘‘নুহ’’ (আঃ) যুগের মহাপ্লাবন থেকে বাংলার ইতিহাস ও ‘বঙ্গ’’ নামের উৎপত্তি শুরু হয়’’ - ২৫শে জুন ২০০৮

(২) ‘‘এ অঞ্চলের জনগণ যে সেমিটিক আরবগোষ্ঠিরই অধঃস্তন পুরুষ তাতে আর সন্দেহ কি?’’ - ১২ নভেম্বর ২০০৭।

(৩) আরবী আল্লাহ-র ভাষা - ০৯ই মে ২০১১

আতংকের কথা হল জাতির বহু বাচ্চাদের ওরা এভাবেই জাতিরই বিরুদ্ধে গড়ে তুলছে। ছাপান্নো হাজার বর্গমাইলে এখন মাদ্রাসার সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার (বিতর্কিত)। দমকলের হোস পাইপের পানির মত ওরা সমাজে ক্রমাগত উগরে দিচ্ছে অসংখ্য শারিয়াবাজ। মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রী এখন ৭৫ লক্ষ (ইনকিলাব ০৩ জুন ২০১১)। সংখ্যাটা কাছাকাছিও হলেও একবার কল্পনা করুন। ওদেরও নাগরিক অধিকার আছে, ভোটের অধিকার আছে। জাতিকে এই সাইক্লোনের সম্মুখীন হতেই হবে একদিন।

ড. মুনতাসির মামুন জনকন্ঠে প্রকাশিত নিবন্ধে লিখেছেন – “মাদ্রাসার দু’টি ডিগ্রীকে প্রচলিত স্কুল-কলেজের ডিগ্রীর সমমর্যাদা দেয়া হয়েছে যদিও দুটি আকাশ-পাতাল তফাৎ। আমাদের ভর্তি ব্যবস্থায় ৬০% নম্বর রাখা হয়েছে ঐ দু’টি ডিগ্রীর ফলের ওপর। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাদের ছাত্রদের ৯০-৯৫ ভাগের কম নম্বর দেয় না। এবং যেহেতু তারা মুখস্থ বিদ্যায় পারদর্শী, সেহেতু টিক চিহ্ন প্রশ্নে তারা নম্বর বেশি পায়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সমাজ বিজ্ঞান প্রভৃতি অনুষদে এখন মাদ্রাসার ছাত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সিভিল প্রশাসনের ক্যাডারেও”

এত সমঝোতা করার পরেও আ-লীগ কি ওদের মন পেয়েছে? পায় নি। ওরা আ-লীগকে ছোবলের পর ছোবল মেরে চলেছে। দেখুন ০৩ জুলাই সংগ্রামের সম্পাদকীয়ঃ- ‘‘পঞ্চম সংশোধনী : রাষ্ট্রধর্ম ও বিসমিল্লাহ নিয়ে প্রতারণা’’।  

এখনো ওরা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশী দ্বারা পরিত্যক্ত কিন্তু সময়ের সাথে ওদের শক্তি বাড়বে। অত্যন্ত গভীরে অত্যন্ত সুধীরে বাংলাদেশের শারিয়া রাষ্ট্র হয়ে যাবার পদধ্বনি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে। এটা সত্যি যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতি এখনো ওদের প্রতিরোধ করে চলেছে। কিন্তু পরিণাম নির্ভর করবে এটার ওপর - করাপ্ট রাজনীতিকে পাশ কাটিয়ে জাতি ইসলামের অরাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিয়ে মৌলবাদীদেরকে প্রতিহত করবে কি করবে না।

আগে কল্পনা করা যেত না - জনগনের একটা অংশ নিজেদের উদ্যোগেই জবরদস্তি অন্যের ওপরে শারিয়া প্রয়োগ করছে যেমন, গ্রামে এক বৃদ্ধার স্বামী মারা যাবার তিরিশ দিন পরে সে ঢাকায় তার প্রথম নাতনী'র জন্মদিনে আসতে চেয়েছিল, লোকেরা তাকে বাধা দিয়েছে. কারণ শারিয়া মোতাবেক বিধবা চল্লিশ দিন পর্য্যন্ত বাড়ীর বাইরে যেতে পারবে না আইনটা শারিয়াতে আছে কিন্তু এ আইন বানানোর সময় পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, এখন ওটা আর প্রয়োগ করা যায় না আবার কখনো এমন কিছু প্রয়োগ করা হয় যা শারিয়া আইনে মোটেই নেই কিন্তু তারা ওটাকে শারিয়া মনে করছে। যেমন এক মোল্লা জবরদস্তি ঘোষণা করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে মসজিদের সামনে দিয়ে নারীদের হেঁটে যাওয়া বন্ধ করেছিল, পুলিশের গুঁতো খেয়ে সে শায়েস্তা হয়েছে। এভাবে চললে একদিন মিসর বা পাকিস্তানের মত বৃহত্তর জনগোষ্ঠী শারিয়া রাষ্ট্র চাইবে (পাকিস্তানে প্রায় ৮২%, মিসরে প্রায় ৬৬%), তখন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই আমরা শারিয়া রাষ্ট্র হয়ে যাব. এখনো সময় আছে, শারিয়াকরণের কিছু পদ্ধতিকে এখনো ফেরানো সম্ভব - যেমন ফতোয়াবাজীর বিরুদ্ধে যে আইন আছে তার শক্ত প্রয়োগ ও অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ইসলামের অরাজনৈতিক ব্যাখ্যার বইগুলোকে প্রচার করা, রাজনৈতিক ইসলাম কেন ইসলাম বিরোধী তার ওপরে মুসলিম বিশেষজ্ঞদের (যেমন ড. বাসাম তিবি, ড. সুভি মনসুর, ড. খালেদ আবু আল ফাদেল, ড. আসগর আলী ইঞ্জিনিয়ার, ড. আব্দুল্লাহ আননাঈম প্রমুখ) বইগুলো প্রচার করা ইত্যাদি 

জিন্নাহ'র পাকিস্তান কিংবা মুজিবের বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ সেকুলার - ধর্মনিরপেক্ষ  সেখানে বায়তুল মুকাররম ও ইসলামী ফাউন্ডেসন ধরনের রাষ্ট্রীয় ইসলামী প্রতিষ্ঠান বানানোর বিপদ হল এই যে ওগুলো ক্রমে রাজনীতিকের হাত থেকে ফসকে গিয়ে ধর্মদস্যুদের খপ্পরে পরার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়  পাকিস্তানে এমন সবগুলো প্রতিষ্ঠান ভয়াবহভাবে মৌলবাদীদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে এগুলো মোটা দাগের ঘটনা. চোখে পড়েনা এমন অনুসঙ্গই বেশী বিপজ্জনক; সেটা হল ইসলামী প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে এসে সুপরিকল্পিতভাবে জাতিকে রাজনৈতিক ইসলামের দিকে ঠেলে দেয়া . যেমন, জিন্নাহ'র পাকিস্তান কিংবা মুজিবের বাংলাদেশ ছিল সেকুলার  সেখানে বায়তুল মুকাররম ও ইসলামী ফাউন্ডেসন ধরনের রাষ্ট্রীয় সরকারী প্রতিষ্ঠান বানানোর বিপদ হল এই যে ওগুলো ক্রমে রাজনীতিকের হাত থেকে ফসকে মৌলবাদীদের খপ্পরে পরার সম্ভাবনা থেকেই যায়  পাকিস্তানে এমন সবগুলো প্রতিষ্ঠান ভয়াবহভাবে জামাতিদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে  এটা ঠিক যে মৌলবাদের দিক দিয়ে দুনিয়ার মুসলিম মেজরিটি দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য ভালো করছে আমাদের সংবিধানে লেখা নেই দেশের সংবিধান বা বিচারপদ্ধতির উত্স হবে শারিয়া আইন. অন্যান্য কিছু দেশে বেসরকারী শারিয়া কোর্টগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী কিন্তু বাংলাদেশে তা দুর্বল ও মৃতপ্রায়  ওসব দেশে এসব কোর্টের প্রতি জনগনের মনোভাব নতজানু কিন্তু বাংলাদেশে তা জনগনের ঘৃণার ও দ্রোহের পাত্র. ফতোয়ার আদালতে অত্যাচার হলে ছুটে যাচ্ছে পুলিশ, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মীরা, সংবাদমাধ্যমে উঠছে ধিক্কারের ঢেউ, হাতকড়ি দিয়ে মোল্লাকে হাজতে পুরছে পুলিশ। অন্য বেশকিছু মুসলিম দেশে রাস্তায় ডাণ্ডা হাতে ঘুরছে "ইসলামী" পুলিশ (হিসবাহ), খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোন মেয়ের চুল বেরিয়ে আছে হেড-স্কার্ফ থেকে, কোন মেয়ে কোন ছেলের সাথে বাজারে গেল, - পার্কে বসে থাকা স্বামী-স্ত্রীর কাছে নিকাহনামা আছে কিনা - ইচ্ছেমত ধরে পেটাচ্ছে বা টেনে হিচড়ে বন্দী করছে থানায় এই ভয়াবহ দৃশ্য বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায় না

আজ করা যায়না, কিন্তু কাল? পরশু? কিংবা তার পরদিন?  দু'ধরনের পাঠক বলতে পারেন আমি অবাস্তব আতংকের বায়বীয় ঢক্কানিনাদ বাজাচ্ছি:- 

(1) যাঁরা চান দেশটা ওরকম হয়ে যাক কিন্তু হয়ে যাক চুপিসারে, না ঘটা পর্য্যন্ত জনগণ যাতে ঘুমিয়ে থাকে. তারপর ইরাণের মত ঘুম ভেঙ্গে দেখবে অনেক দেরী হয়ে গেছে.

(2) যাঁরা জানেন না পঞ্চাশ বছর আগেও কোনো পাকিস্তানী, ইরাণী, মালয় বা ইন্দনেশিয়ানকে যদি জিজ্ঞাসা করা হত - "তোমাদের দেশ কি শারিয়া রাষ্ট্র হয়ে যাবে?" তারা ঘাড় ঝাঁকিয়ে অট্টহাসী হেসে বলত - "তোমার কি মাথা খারাপ? আমাদের দেশ হবে মোল্লারাষ্ট্র ?? হাহ!!”.

আজ তারা অবিশ্বাসের চোখে অসহায় তাকিয়ে দেখছে - তাই, ইতিহাসের এসব বাস্তব প্রমাণ দেখে সাবধান হওয়া ভাল. কারণ দড়িকে সাপ মনে করলে সুবিধে নেই কিন্তু সাপকে দড়ি মনে করলে সে ভুলের মাশুল প্রাণ দিয়ে শোধ করতে হয়. আজ সেটাই করছে ওসব দেশের নারীরা, ভিন্নমতের মুসলিমরা আর সুশীল সমাজ. এ মহা সর্বনাশ ওদের যদি হতে পারে, হতে পারে আমাদেরও.

RELATED - "বাংলাদেশের শরিয়াকরণ: সুদে ও আসলে গুনতে হবে কি দেনা?"- BDNEWS24.COM  04 May 2017 - বাংলাদেশের শরিয়াকরণ: সুদে ও আসলে গুনতে হবে কি দেনা?    https://bangla.bdnews24.com/opinion/47440

******************************************************


 


Print