বিদেশে বাংলাদেশি-সংস্কৃতির অর্ধ শতাব্দী : ১৯৭৫ – ২০২৫ (সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা)
নিবন্ধটি এই বইতে প্রকাশিত- https://www.rokomari.com/book/546948/kanaday-ekattor-bangalir-obhiggota
সাহিত্যকর্মী, লেখক গবেষক সুব্রত কুমার দাস-এর দীর্ঘদিনের প্রচণ্ড পরিশ্রমের ফসল ৫৬০ পৃষ্ঠার এই বর্ণাঢ্য বইটি স্পনসর করেছেন ব্যারিস্টার সূর্য চক্রবর্তী, মনীষ পাল ও বজলুর মারুফ। তাঁদেরকে অজস্র অভিনন্দন জানাই।

বিদেশে প্রায় দেড় কোটি বাংলাদেশীর সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতে গেলে (লন্ডন ছাড়া) শূন্য থেকে শুরু করে বিপুল বেগে এগিয়ে যেতে দেখলাম গত ৫০ বছরের বিদেশ জীবনে। দেশের বাইরে আজ বিশ্বজুড়ে আমাদের অগণিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠন, বাংলা স্কুল, গানের স্কুল, নাচের স্কুল, অজস্র অনুষ্ঠান এমনকি নৃত্যনাট্যও, খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, টরন্টোর বাংলা টেলিভিশনের মতো অজস্র টিভি চ্যানেল, রেডিও-ইউটিউব চ্যানেল, ফ্যাশন শো, অসংখ্য কবি-লেখক, চারুকারুকলা শিল্পী, দেশে দেশে শহীদ মিনার, বইমেলা-মিলন মেলা-পিঠামেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, আবৃত্তি সংগঠন ও অনুষ্ঠান, অজস্র নাট্যগোষ্ঠী, মঞ্চস্থ নাটক, মুভি বানানো ও প্রদর্শনী........এবং অবশ্যই তিক্ত-কষায় কিছু কটু অভিজ্ঞতা।
সব মিলিয়ে বিশ্বময় ফুটন্ত ভাতের হাঁড়ির মতো টগবগ করে ফুটছে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির সুবিশাল কর্মযজ্ঞ। তাই আমরা শুধু রেমিটেন্স যোদ্ধা-ই নই, আমরা বিশ্বময় বাংলা সোসিও-কালচারাল ব্রিগেড-ও। এই আমাদের সেই সুবিশাল সাম্রাজ্য যেখানে সূর্য অস্ত যায় না!
এই সাফল্য হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েনি, এর একটা ধারাবাহিকতা আছে। বাংলাদেশিরা লন্ডনে আছেন ব্রিটিশ আমল থেকেই, অন্যান্য জায়গায় বাংলাদেশীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় যাওয়া শুরু হয় ১৯৭৫ সালের দিকে। ঢাকা কলেজের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে এফ এইচ হলের নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদকের প্রায় ৭ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে আবুধাবিতে আসি ১৯৭৫ সালে। তখন থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আবুধাবি-ক্যানাডা মিলিয়ে ৪০ বছর সক্রিয় সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে, এবং ২০১৫ থেকে এখন ২০২৫ পর্যন্ত পর্যবেক্ষক হিসেবে বিদেশে আমাদের সাংস্কৃতিক বিবর্তন দেখেছি। শুরুর দিকে ইন্টারনেটহীন মোবাইলহীন বছরগুলোতে দেশের সাথে যোগাযোগ-হীন প্রবাসী সাংস্কৃতিক কর্মীদের চ্যালেঞ্জ বুঝতে পারা এখনকার হুলুস্থুল ইন্টারনেট ও মোবাইল প্রজন্মের পক্ষে অসম্ভব না হলেও কঠিন তো বটেই।
১৯৭৫ সালের পর আমরা আবুধাবিতে একে একে "বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন", "প্রবাসী নাট্যগোষ্ঠী" ও "শেখ খলিফা বিন জায়েদ বাংলাদেশ ইসলামিয়া স্কুল" প্রতিষ্ঠা করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটক মঞ্চস্থ করা শুরু করি। তখন কোথায় ছিলাম এবং এখন কোথায় আছি, সেই পথরেখা ধরে ঘুরে আসা যাক:-
তখন সেলফোন ইন্টারনেট ছিলনা বলে দেশের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিলনা, আবুধাবিতে তখন গানের স্কুলে শিক্ষিত কন্ঠশিল্পী একজনও ছিলনা, তবলা এবং গিটার শিল্পী ছিল মাত্র একজন করে। আমি আবাল্য হার্মোনিয়াম শিল্পী, আমাদের শখের শিল্পীদেরকে গান শিখিয়ে মঞ্চে তুলতে হতো, বিশেষ করে হর্মোনাইজেশনের গান শেখাতে কি যে পরিশ্রম হতো তা বলার বাইরে,
এখন ইন্টারনেটে নিমেষে শত গান পাওয়া যায় - তখন আবুধাবিতে মিউজিক স্টোর ছিল কিন্তু সেগুলোতে বাংলা গানের ক্যাসেট ছিল না (তখন গানের ক্যাসেট ছিল)। অথচ গানের শুদ্ধতা নিশ্চিত করতে ক্যাসেট ছাড়া উপায় ছিল না। তাই দেশ থেকে গানের ক্যাসেট এনে সেগুলো থেকে শিল্পীদেরকে গান শেখাতাম,


- এখন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা অনুষ্ঠানের খরচ স্পন্সর করেন। কিন্তু তখন সব খরচ আমরাই সামলাতাম কারণ বাংলাদেশিরা ব্যবসায়ে তখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি বলে স্পন্সর পেতাম না,
- বাংলা খবরের কাগজ বা ম্যাগাজিন ছিল না, কম্পিউটারে বাংলা লেখার প্রযুক্তি ছিলনা,
- একাডেমিক আলোচনা বিতর্কের অনুষ্ঠান হতোনা, সাহিত্যিক কর্মকাণ্ড ছিলনা,
- দেশে প্রবাসী লেখক ও গায়কদের বই বা গানের সিডি বের হতোনা,
- অনুষ্ঠানে স্ক্রিপ্টের কবিতা ছাড়া আলাদা করে কবিতা আবৃত্তি হতোনা,
- কোন অনুষ্ঠান ভিডিও রেকর্ড করা হতোনা,
- একান্ত ব্যতিক্রম না হলে দেশ থেকে শিল্পী এনে অনুষ্ঠান করা হতোনা,
- কয়েক বছরের মধ্যে সমাজে গড়ে উঠেছিল দক্ষ সাংস্কৃতিক শক্তি,
- সাংস্কৃতিক-সাংগঠনিক অঙ্গনে হিংসা, পরনিন্দা বা নেতৃত্বের গুঁতোগুঁতি ছিলনা।
- বৃহত্তর সমাজে ঈদ বা জানাযার নামাজে অংশ নেয়া ইত্যাদির বাইরে সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের ছোট্ট একটা নিজস্ব সাংস্কৃতিক জগৎ ছিল। সেখানে রিহার্সেলগুলো ছিল আনন্দের ঝরনা, আমরা এক পরিবারের মতো অনাবিল আনন্দে পরস্পরের সাথে চড়ুই পাখির মত সদাব্যস্ত কর্মচঞ্চল বছরগুলো কাটিয়েছি,
- ১৯৯০ সালে ক্যানাডায় ইমিগ্রেশন নিয়ে আসার পর আমেরিকা-ক্যানাডার বাংলাদেশি সমাজে প্রবেশ করি ভারতীয় বাঙ্গালীদের আমেরিকা-ক্যানাডার বৃহত্তম অনুষ্ঠান বিশাল "বঙ্গ সম্মেলন"-এ আট-দশ হাজার দর্শকের সামনে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ও কয়েকটা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে। এর পরেই ১৯৯৩ সালে টরন্টোতে তিন দিন ধরে অনুষ্ঠিত সুবিশাল ফোবানা (ফেডারেশন অফ বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশন্স অফ নর্থ আমেরিকা) ৭ম অনুষ্ঠানে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকে দেখলাম:-
(ক) ফোবানা তখন বাংলাদেশের বাইরে আমাদের বৃহত্তম বাৎসরিক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক তীর্থ যা আমেরিকা-কানাডার কোন শহরে সেই শহরের বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হতো, এবং,
(খ) ১৯৯৩ সালে আমার শহর টরোন্টো'তে সেই অনুষ্ঠান ছিল অবিভক্ত ফোবানার ৭ম ও শেষ অনুষ্ঠান। এরপরেই ঘোরতর অন্তর্দ্বন্দ্বে ফোবানা দ্বিখন্ডিত হয়ে পরের বছর লজ্জাজনকভাবে একই দিনে নিউ জার্সি এবং বোস্টনে অনুষ্ঠিত হয়। সে বিভক্তি আজও জোড়া লাগেনি। শুনেছি তারপর থেকে আজ পর্য্যন্ত কোন কোনো বছর একই দিনে তিন ভিন্ন ভিন্ন শহরে তিন ফোবানা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ অভিজ্ঞতা আমার জন্য ছিল মর্মান্তিক,
- আমাদের মুখে আরো চুনকালি পড়ল যখন দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় প্রকাশ পেল ফোবানার কিছু আয়োজক বাংলাদেশ থেকে শিল্পী আনার পাশাপাশি গোপনে শিল্পী পরিচয়ে অশিল্পী এনে আদম ব্যবসা শুরু করেছে। সেটা এখনো চলছে - সার্চ "ফোবানার নামে আদম ব্যবসা", উদ্ধৃতি:- "এখন কমপক্ষে চারটি পৃথক সম্মেলন হয় বছরের একই সময়ে ........একটি অংশের ফোবানার একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশে বেশ কয়েকজন লোকের সঙ্গে রীতিমত চুক্তি করেছেন ভিসা পাইয়ে দেওয়ার। ৪০ লাখ টাকায় ভিসার গ্যারান্টি দিয়েছেন ফোবানার ওই কর্মকর্তা" - নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আমেরিকার বৃহত্তম বাংলাদেশি পত্রিকা "ঠিকানা" - ১৩ মার্চ ২০২৫ ও আরো অনেক মিডিয়া,
- ফোবানা এভাবে কলঙ্কিত হবার পর বিভিন্ন শহরে কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন দেশ থেকে শিল্পী এনে ফোবানার মতোই অনুষ্ঠান করা শুরু করেছে যা এখনো ভালোই চলছে। জেলা-ভিত্তিক সংগঠনগুলোও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছে,
- এক পর্যায়ে অডিটোরিয়ামের বাইরে শাড়ি গয়না উপহার সামগ্রী বিশেষ করে চা নাস্তার স্টল চালু হলো। এতে অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা হবার আনন্দ-মুখরিত আড্ডার পরিবেশ থাকে,
- একসময় অনুষ্ঠান-সূচি, দোকান ও ব্যবসার বিজ্ঞাপন, শিল্পীদের নাম-ধাম ছবি ও গল্প কবিতাসহ স্যুভেনীর প্রকাশের সংস্কৃতি শুরু হলো। কিন্তু এখন সেটা কমে গেছে কারণ সম্পাদনা ও ছাপানোর পেছনে প্রচুর পরিশ্রম, সময় এবং টাকা খরচ হয়। তাছাড়া অনুষ্ঠান শেষে ওটার জায়গা হয় ট্র্যাশ বা রিসাইকল বিনে,
- শুরুতে যা কল্পনাই করা যেত না, দেশে দেশে এখন আমাদের প্রফেশনাল রেকর্ডিং স্টুডিও, শব্দযন্ত্রী এবং বাদ্যযন্ত্রী আছেন। পঞ্চাশ বছর আগে বিদেশে কোন বাদ্যযন্ত্রের দোকানও ছিলনা (সম্ভবত: লন্ডন ছাড়া) এখন আছে,
- অনুষ্ঠানের ছবি। ভাবতে অবাক লাগে কি অবিশ্বাস্য বছরগুলোই না আমরা পার হয়ে এসেছি! রিল কিনে ক্যামেরায় লাগিয়ে ছবি তুলে রিলগুলো ছবির দোকানে দিতে হতো, তারা ডার্করুমে প্রসেস করে কয়েকদিন পর ছবিগুলো আমাদেরকে দিত। সেই কয়েকদিন আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতাম,
- একসময় অনুষ্ঠানে গুণীজনদেরকে সম্মাননা পদক দেয়ার প্রথা শুরু হয়। টরন্টোতে আমাদের আবৃত্তি সংগঠন "বাচনিক"-এর বাৎসরিক অনুষ্ঠানে আমরা ২০১৭ থেকে এখন পর্যন্ত প্রধানত: কবিতা ও আবৃত্তি সংশ্লিষ্ট কোন গুণীজনকে সম্মাননা পদক দিয়ে আসছি। টরোন্টোর ছায়ানট সংগঠনও "গুণীজন পদক/ক্রেস্ট" দিয়েছেন,
- বাচ্চাদেরকে সাহিত্য-সংস্কৃতিতে জড়িত করার কথাটা আমরা আবুধাবিতে ভাবিনি। ক্যানাডায় উদীচী সহ কিছু সংগঠন এবং ২০১৮ সাল থেকে বাচনিক শিশু-সদস্য যুক্ত করে তাদের নিয়ে কাজ করছে।
- আমাদের কেউ কেউ (আমি সহ) সংস্কৃতিতে অবদান রাখার জন্য কানাডা সরকারের কাছ থেকে সম্মাননা পত্র পেয়েছেন,
- বিশ্বজুড়ে আমাদের আরেকটা শুভ-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সেটা হলো দেশে বন্যা ও শীতার্তদের পাশে তাৎক্ষণিকভাবে দাঁড়ানো সংগঠনগুলো। এর পাশাপাশি আছে লন্ডনভিত্তিক Earn N Live এবং টরন্টো ভিত্তিক ICAS (Innovative Care and Support)-এর মতো চলমান সংগঠনগুলো। ইনারা চাঁদা তুলে জনকল্যাণ করেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে ইনাদেরকে এবং এমন আরো অনেককে চিনি, ইনাদের মতো বিদেশ থেকে অজস্র বাংলাদেশি বিভিন্ন চ্যারিটি করে থাকেন - এইসব অজানা হিরোদের একটা তালিকা বানানো দরকার। কিছু প্রতারকের কথাও শোনা যায়, তাই সাবধান হওয়া জরুরী,
- ২০২০ সালে কোভিড মহামারী শুরু হলে বিশ্বজুড়ে মানুষ গৃহবন্দী হয়ে পড়ে। মঞ্চের অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় কিন্তু এক নতুন অভাবনীয় দিগন্ত খুলে যায়। সেটা হলো জুম বা স্ট্রিমইয়ার্ডে কম্পিউটার স্ক্রিনে নিজের বাসা থেকেই অনেকে মিলে অনুষ্ঠান করা। যদিও ওটা মঞ্চ-অনুষ্ঠানের বিকল্প নয় তবু গৃহবন্দি বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশীরা ওভাবে অসংখ্য অনুষ্ঠান করেছেন। এখন মঞ্চের অনুষ্ঠান কিছুটা ফিরেছে কিন্তু এখনো ওভাবে কিছু অনুষ্ঠান হয়,
- পরের দিকে প্রবাসের অনেক সাহিত্যিক দেশে ও কলকাতায় পুরস্কার-পদক পেয়েছেন, অনেকের লেখা বই দেশের এবং বিদেশের ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো হয়। এছাড়া প্রবাসী গীতিকার, সুরকার ও গায়কের অনেক মিউজিক ভিডিও বাজারে পাওয়া যায় যা শুরুর দিকে কল্পনাও করা যেত না,
- মাঝখানে একটা বিরক্তিকর ঘটনা ঘটল। শুরুতে আমরা সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মীরাই এ অঙ্গনের নেতৃত্বে ছিলাম। কিন্তু একটা সময় থেকে কিছু চতুর ও ধূর্ত চেয়ার-ভিক্ষুক ও মাইক্রোফোন-ভিক্ষুক কি করে যেন কিছু সংগঠনে নেতা বনে যাওয়া শুরু হলো। সাহিত্য সংস্কৃতিতে-এদের জ্ঞান বা আগ্রহ দুটোই প্রশ্নবিদ্ধ। এতে সংগঠন দুর্বল হয়, কখনো ভেঙে যায়, অনুষ্ঠানের মান নষ্ট হয়, সাহিত্য সংস্কৃতির আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়,
- একটা বুকভাঙ্গা দুঃসংবাদ দিয়ে শেষ করি। বিদেশে সাহিত্য সাংস্কৃতিক নেতাকর্মীদের ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন বাল্যবন্ধুরা প্রায়ই কাছে থাকে না। অর্থাৎ বিদেশে আমরাই পরস্পরের ভাই-বোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু। অসুস্থ হলে হাসপাতালে তারাই দেখতে আসে, মৃত্যুর পর তারাই চোখের জলে আমাদেরকে গোরস্থানে-শ্মশানে নিয়ে যায়। সুদীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী ধরে বিদেশে শত প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের এই সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ছোট্ট সমাজ গড়ে উঠেছিল। সেখানে নিয়মিত দাওয়াতের বিরিয়ানি-ইলিশ ভাজা, গান কবিতার সান্ধ্য আড্ডা, গিফট আদান-প্রদান, মাঝে-মাঝে পিকনিক ইত্যাদি আনন্দ ঝর্ণায় এতগুলো বছর কেটেছিল।
কিন্তু গত পাঁচই আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী সরকারের পতনের পর দেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অপসংস্কৃতি বিদেশে আমাদের সেই আনন্দের নীড় ভেঙেচুরে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। এত বছরের এত নিবিড় সম্পর্ক এত দাওয়াত, এত সুখস্মৃতি সব হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, কোন কোন ক্ষেত্রে সংগঠন ভেঙেছে এবং অবিশ্বাস্য রকম শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছে। এই সর্বনাশ শুধু আমাদের টরন্টোতেই নয়, খোঁজ নিয়ে দেখেছি অন্যান্য দেশের শহরেও হয়েছে।
জানিনা এই ভয়াবহ অন্ধকূপ থেকে বেরোতে আমাদের কত প্রজন্ম লাগবে।
কিংবা আদৌ আমরা তা পারবো কিনা।